. Informed . Opinions .

September 15, 2015

চেনা গপ্পো

Filed under: Holy Fcuk, India — Raja @ 3:43 PM

কল্লোলবাবুর দিকে তাকিয়ে সন্ন্যাসী বললেন, “কি রে শুও.. …চ্চা, চিনতে পারছিস? বেশ তো গোঁফ কামিয়ে চশমা লাগিয়ে গুছিয়ে বসেছিস দেখছি এখানে”
কল্লোলবাবু গ্রামের স্কুলের নতুন বাঙলা টিচার। প্রথমে চমকে গেলেও সামলে নিলেন। একটু রেগেই গেলেন বলতে গেলে। বললেন, “কি হচ্ছে কি? পুলিশে জানতে পারলে পেঁদিয়ে গৌরীকান্ত করে দেবে যে |”
“আঁ, গৌরীকান্তর কি হয়েছে আবার?”
“আঃ, গৌরীর কিছু হয় নি, ওর বাপের নাম খগেন ছিল । ….. তাই বললাম |”
“খুব কথা ফুটেছে দেখছি? তা ভালো, একটা থাকার ব্যবস্থা কর দেখি এখানে। সাধু সন্ন্যাসী তান্ত্রিক দের বাজার দর কেমন চলছে এখানে? আরো দু-চার জায়গা ঘুরে দেখলাম, বুঝলি, লোক-এর ভক্তি আছে তো পয়সা নেই, পয়সা আছে তো ভক্তি নেই. দুনিয়াটা নরাধমে ভরে গেল রে |”
“দেখি কি করতে পারি।”
“দেখি টেখি নয় বাপু, আমায় কোথাও যেতে হলে এবার তোমায় সঙ্গে নিয়ে যাব, খেয়াল রেখো ।”
“by the way, দাড়িটা কি আসল না নাটকের দল থেকে ঝাড়া?”
“এই দাড়ি বানাতে গেলে আমাকে আড়াই বছর বয়স থেকে দাড়ি রাখতে হত রে হারামজাদা”
“আঃ, ভাষাটা একটু সংযত করুন |”
“ওরে বান…”
“থাক থাক. এবার শুনুন কি করতে হবে |”
“বলে ফেল, ততক্ষণ আমি মুড়ি বাদাম দিয়ে দু পেগ মেরে নি |”
“শুনুন। ওই দুরে সাদা বড় বাড়িটা ব্রজবিলাস বাবুর। বড়লোক। ধার্মিক মানুষ। ওনাকে পটাতে পারলে আধেক মুশকিল আসান। পারবেন?”
“ও তুই আমার ওপর ছেড়ে দে | বাকি প্ল্যান বল |”
“ওনাকে দিয়ে শুরু করুন। আমি দেখছি আপনাকে হিমালয় ফেরত বলে চালিয়ে কিছু ব্যবস্থা ……..”
“পাগল না হরিশ্চন্দ্র? খবর্দার হিমালয় বলিস না – হিমালয়ের ঢপ দিতে গিয়ে এক জায়গায় রাম ক্যালান খেয়েছি। জায়গাটা সুবিধের নয়, চেনাশোনার মধ্যে কোনো জায়গা বল”
“specialization কি বলবো? পারিবারিক শান্তি? গুপ্তরোগ?”
“না না, রোগ টোগ নয়. লোক ভাড়া করে নাটক করাতে অনেক টাকা লাগবে । মন্ত্রপূত ফুল দিতে পারি – অনেক practice করেছি ………”

ব্রজবিলাস বাবুর বাড়ির পাশে রাতারাতি একটা ছোট বাড়ি তৈরী হলো – রতনলাল বাবার আশ্রম। ধুলাগড়ি ধামের কথা আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। রতনলাল যে সে সন্ন্যাসী বা তান্ত্রিক নয়. আজকাল তো আকছার হিমালয়-ফেরত সাধু সন্ন্যাসী দেখা যায় দেশের আনাচে কানাচে। কিন্তু রতনলাল সবার চেয়ে আলাদা। হিমালয়ে হাজার হাজার বছর ধরে তপস্যা করে সাধু সন্ন্যাসীরা হিমালয়ের জ্ঞানের ভান্ডার শুষে নিয়েছেন একেবারে। সেখানে তপস্যা করে কোনো জ্ঞানলাভের আশা নেই বুঝতে পেরে রতনলাল তপস্যা করেছেন সুন্দরবনে। আড়াই বছর বয়স থেকে। অবশ্য এ ব্যাপারে সন্ন্যাসীমশাই কিছু বলেন না – নিজের ঢাক পেটানো সাধু সন্ন্যাসীদের মানায় না | এ সব কল্লোলবাবু স্বপ্নে জেনেছেন।

আড়াই বছর থেকে বিয়াল্লিশ বছর কঠোর তপস্যা আর তন্ত্রসাধনা করার পর একদিন হঠাৎ তপস্যারত রতনলালকে একটি বাঘ আক্রমণ করে | ক্রোধিত রতনলাল বাঘটিকে এক চড় মারেন। সেই চড়েই বাঘ মারা যায় আর মৃত বাঘ থেকে স্বয়ং মহাদেব বেরিয়ে বলেন, “বাবা রতন, তোমার সাধনায় আমি খুব happy, তুমি এই বাঘের চামড়া আমার একনিষ্ঠ ভক্ত বড়বাজারের রাকেশ ঝুনঝুনওয়ালাকে দিও | সময় সুযোগ পেলে আবার এসো, আমি আবার বাঘ রূপ ধারণ করে তোমার সামনে আসব | আমার আরো কিছু মারোয়াড়ি ভক্তের মনস্কামনা পূর্ণ করব তোমার পুণ্য হাত দিয়ে ।”

এভাবেই চলছিল। কিন্তু সুন্দরবনে বেশ কয়েকবছর হোলো পুলিশের নজর বেড়ে যাওয়াতে মহাদেব ক্ষুণ্ন হলেন – দেখা দেওয়া বন্ধ করে দিলেন। তখন রতনলাল বেরিয়ে পড়লেন দেশের সাধারণ মানুষের সেবা করতে। তবে যেহেতু পুলিশের অধার্মিক আচরণে মহাদেব ক্ষুণ্ন হয়েছিলেন, সেহেতু রতনলাল পুলিশ দেখলেই নিজেকে মায়াবলে অদৃশ্য করে ফেলেন।

এহেন মহাপুরুষের কথা ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগে না | গ্রামের প্রাচীন বটবৃক্ষের তলায় রোজ সন্ধে বেলা ভক্তের ভিড় উপচে পড়তে লাগল। কল্লোলবাবুর তত্ত্বাবধানে গ্রামের স্কুলের ছেলে-মেয়েরা ভক্তিমূলক নাটক পরিবেশন করতে লাগলো প্রতি রবিবার। ধুলাগড়ি ধাম এতই বিখ্যাত হয়ে উঠলো যে হাওড়া-কোলকাতা থেকে লোকজন আসার সুবিধে করতে হাওড়া-ধুলাগড়ি মিনিবাস চালু করার ব্যবস্থা করলেন গ্রামের দুই মাতব্বর – রঞ্জনগোপাল দত্ত আর শিবাশীষ মুখোপাধ্যায় ।

শনি-রোববার করে হাওড়া কোলকাতা থেকে পাপীতাপী লোকজন আসতে লাগলেন। যাঁরা আসতে পারছেন না তাঁরা বাবার ছবির জন্য বায়না করলেন। তবে রতন বাবার আস্তানার কোন ছবি তোলা ছিল বারণ। শোনা যায় মহাদেব যেমন পুলিশ পছন্দ করেন না, তেমন ক্যামেরা দেখলেও ক্ষেপে যান | রতনবাবুই নাকি তার জন্যে দায়ী। মহাদেবের সঙ্গে কোনো এক সাক্ষাত্কারে রতনবাবু তাঁর ছবি নিতে গিয়েছিলেন। ফ্ল্যাশ দেওয়ায় মহাদেবের নেশা চটকে যায় আর তিনি ক্যামেরা ভস্ম করে দেন |

যাহোক, ফটো তোলা না যাক, ছবি আঁকা তো যায়. কল্লোলবাবু কলকাতা থেকে শিল্পী আনিয়ে, ছবি আঁকিয়ে, ফোটোকপি করে, সুলভ মূল্যে তা ভক্তগণের মধ্যে বিতরণ করতে লাগলেন।

আঁকা ছবিতে এখনো দেখা যায় উপচে পড়া ভিড় | দেখা যায় রতনলাল বাবার মাথার পিছনে এক জ্যোতির্ময় বলয় যা বটগাছের নীচের অন্ধকারকে দূর করে দিয়েছে । আর দেখা যায় বটগাছের ওপর থেকে ঝুলে পড়া দুটি সুদীর্ঘ লাঙ্গুল। ধুলাগড়িতে বছর তিনেকের বাসিন্দা একটি হনুমান পরিবারের লাঙ্গুল ওইদুটি। তারা পাশের কলাঝাড় থেকে কলা চুরি করে এনে এই গাছে বসে খায় আর বাবার অমৃতবাণী শোনে।

দিন যায়, মাস যায় – বাবা এসেছিলেন চৈত্রের শেষে । দেখতে দেখতে এসে গেল ভাদ্রমাস । বটবৃক্ষের নীচে রবিবার সকালের ভিড় – তিলধারণের জায়গা নেই | এক মহিলা বাবার কাছে নিজের দুরবস্থার সবিস্তার বিবরণ দিলেন। বাবা আকাশে হাত পাতলেন, একটি রক্তজবা কোথা থেকে এসে গেল তাঁর হাতে। রক্তজবা নিয়ে মহিলা কাঁদতে কাঁদতে বাবার পায়ে লুটিয়ে পড়লেন। যাহোক, কিছু ভক্ত তাকে সরিয়ে নিয়ে গেল | এবার এক মাঝবয়স্ক পুরুষ তার দুঃখের কাহিনী শোনাতে বাবা আবার আকাশে হাত পাতলেন। রক্তজবা এলো. কিন্তু তার ওপর এসে পড়ল একটা কলা |

তারপর যা হলো তা মহা প্রলয় |

সুন্দরবনের বাঘকে চড়-কষানো রতনলাল বাবার সাড়ে উনচল্লিশ বছরের দাড়ি আর বিয়াল্লিশ বছরের চুল ধুলাগড়ির হনুমানের এক থাপ্পড়ে উড়ে গিয়ে বটগাছের ডালে আটকে গেল | ভক্তদের মধ্যে নেমে এলো প্রবল বিস্ময় |

কল্লোলবাবু হঠাৎ বলে উঠলেন – “আহা, বাবার কি মহিমা। এ কি দেখলাম আজ! আরে এ তো ওপরের লেভেলের খেলা। মহাদেবের সঙ্গে স্বয়ং হনুমানের খুনসুটি। আমরা আজ ধন্য হয়ে গেলাম।”

কেউ অবিশ্বাস আর কেউ ভক্তিময় বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল |

তার মধ্যে থেকে একজনের চিৎকার শোনা গেল, “সালা বহেন…. হামাকে নকলী টাইগার স্কিন সেল কিয়ে বাবা বনকে বয়ঠা হ্যায় য়াহাঁ ……. পকড়ো সালেকো ……”

======================

এই পর্যন্ত বলে কপুজেঠু হঠাৎ জিগ্যেস করলো, “বল রাজা, এর পর কি হোলো?”
আমি বললাম, “এর পর আর কী, দুষ্টু লোকটাকে বোধ হয় পুলিশে ধরলো আর ধুলাগড়ির লোকজন সুখে বাস করতে লাগলো।”
জেঠু বললো, “এ কি তোর্ কেলাস থিরির বাংলা সিলেবাসের গপ্পো রে? সুখে বাস করতে পারে গপ্পোতেই। কারণ গপ্পেই লোকজন সুখে বাস করতে চায় |”
“তাহলে কি হলো তার পর?”
“দিন তিনেক পর কল্লোলবাবু স্বপ্ন পেলেন যে রতনলাল বাবাই সাক্ষাৎ মহাদেব – আর তিনি চান যে কল্লোলবাবু রতনলালের আশ্রমে রতনলালের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পুজো চালু করুন। তার পর ‘আশ্রমের’ আশেপাশে যারা চা-তেলেভাজা-সিঙ্গাড়া-কচুরি বিক্রি করত, তারাও টপাটপ সেই একই স্বপ্ন ‘পেতে’ লাগলো। রতনলাল থাকতে যত না ভিড় হত, এখন তার চেয়ে বেশি ভিড় হতে লাগলো | এমনকি, পরের বছর থেকে চৈত্র সংক্রান্তিতে রতনলালের ধুলাগড়িতে শুভাগমন উপলক্ষে ‘আগমনী মেলা’ চালু হয়ে গেল |”
“আর সেই রতনের কি হলো?”
“তিনি মায়াবলে পুলিশের ভ্যান থেকে নিজেকে অদৃশ্য করে নিয়েছিলেন আর কি | গুজব শোনা যায় যে এখন নাম আর পোশাক পাল্টে অন্য এক ধর্মের গুরু হয়ে বসেছেন।”
“পুলিশ আবার ধরছে না কেন?”
“তুই বুঝবি না – আমাদের secular country কিনা ……”

Advertisements

Leave a Comment »

No comments yet.

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Please share your opinion

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

Create a free website or blog at WordPress.com.

%d bloggers like this: